শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

অবক্ষয় যখন প্রান্তিকতায়

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুরো দেশটাই অপরাধ ও অবক্ষয়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তবে একথা বলার অবকাশ নেই যে, আমরা জাতিগতভাবেই মূল্যবোধহীন হয়ে পড়েছি। আমরা জাতি হিসাবে সৎ, সজ্জন ও মূল্যবোধসম্পন্ন। তবে কিছু সংখ্যক মূল্যবোধহীন ও অপরাধপ্রবণ লোকের কারণেই কেউ কেউ একথা বলে পুলকবোধ করেন যে, আমরা জাতিগতভাবেই মূল্যবোধহীন। এই দাবির মধ্যে খানিকটা বাড়াবাড়ি রয়েছে। তবে একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, রাষ্ট্রের সকল সেক্টরেই একশ্রেণির মূল্যবোধহীন লোকের সরব পদচারণা রয়েছে। আর এদের অপকর্মের কারণেই আমরা জাতি হিসাবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোবাবেলা করতে পারছি না বরং বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। 

মূলত, একশ্রেণির মূল্যবোধহীন ও অপরাধপ্রবণ লোকের কাছে পুরো জাতিই আজ অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছে। যারা জনগণের জানমালের রক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই ভক্ষকে পরিণত হয়েছেন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের পুলিশ বাহিনীর কিছু সংখ্যক অতিউৎসাহী সদস্য জনগণের বুকে গুলী চালাতেও কুন্ঠাবোধ করেনি। আওয়ামী আমলে এলিট ফোর্স র‌্যাবের বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্যাংশন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রমাণ হয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে জনগণের ওপর ব্যাপক জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। হয়তো তারা চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। 

সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনার অবতারণা হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, যৌথ বাহিনীর পরিচয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ীর বাসায় ডাকাতির ঘটনায় র‍্যাবের সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা র‍্যাব সদর দপ্তরের একটি শাখার প্রধান ছিলেন। তাঁকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে আগেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

এ ছাড়া এই ডাকাতির ঘটনায় র‍্যাব ৪-এ কর্মরত শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের নাম এসেছে। তাঁদের বিষয়ে র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে । এর আগে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মুনীম ফেরদৌস গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন র‍্যাব সদস্যের নাম বলেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। প্রাপ্তথত্যে জানা গেছে, à§§à§§ অক্টোবর রাত সোয়া তিনটার দিকে মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড়ে বেড়িবাঁধ এলাকায় ব্যবসায়ী আবু বকরের বাসায় ও কার্যালয়ে ডাকাতি হয়। সেনাবাহিনী ও র‌্যাবের পোশাক পরা ডাকাতেরা নিজেদের যৌথ বাহিনী বলে পরিচয় দেন। তাঁরা à§­à§« লাখ টাকা ও ৭০ ভরি সোনা লুট করেন বলে গৃহকর্তা ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় করা মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এই মামলায় গ্রেপ্তার কামাল হোসেন নামের একজন আসামীকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছে র‍্যাব। ডিবি জানিয়েছে, কামাল হোসেন সাবেক সেনাসদস্য। তাঁকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত à§« দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তাঁকে ডিবির হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে আদালত সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তদন্তের কোন অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে ছয়জনের à§­ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাঁরাও ডিবির হেফাজতে আছেন। এই ছয়জনের মধ্যে তিনজনকে ডিবি গ্রেপ্তার করে বলে জানা গেছে। বাকি তিনজনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছিল। আলোচিত এই ডাকাতির ঘটনায় সম্প্রতি আটজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল র‌্যাব। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে পরদিন ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। বাকি পাঁচজন কোথায়, সেটা নিশ্চিত করে জানা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ডিবির কাছে দেওয়া কামাল হোসেন ওই পাঁচজনের একজন কি না, সেটাও র‌্যাব পরিষ্কার করে বলেনি। এমনকি পাঁচজনের নাম-পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে জনমনে রীতিমত কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক ব্যর্থতার জন্য জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বিগত বিএনপি সরকারের আমলে র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ান তথা র‌্যাব গঠিত হয়েছিল। শুরুতেই এলিটি ফোর্স তাদের কর্মদক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং অপরাধ দমনে সফল হওয়ার কারণে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পুরো পাল্টে যায়। জনপ্রিয় এই এলিট ফোর্সকে ব্যবহার করা হয় বিরোধী দলের সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনের জন্য। ফলে সারাদেশেই ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। আর সে প্রেক্ষিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশন। 

মূলত, এলিট ফোর্স র‌্যাবসহ আইনশঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু এসব বাহিনীর নগণ্য সংখ্যক মূল্যবোধহীন সদস্যের অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণতার কারণেই পুরো বাহিনীই রীতিমত ইমেজ সংকটে পড়েছে। এমনকি তারা আওয়ামী রেজিমে রীতিমত প্রান্তিকতায় পৌঁছেছিলেন। এমতাবস্থায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অবিলম্বে এসব মূল্যবোধহীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা অবসরে গিয়ে অপরাধমূলক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। অন্যথায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ